Wednesday, 2 November 2016

দানব

জানলাটা খুলতেই যতরাজ্যের বিরক্তি রিমার মনে উপস্থিত হল। আজও সামনের ফ্ল্যাটের জানলা খোলা আর ভেতরে দানবগুলো ঘোরাফেরা করছে। এই গরমে জানলা বন্ধ করে থাকা কোনমতেই সম্ভব নয়। গত কয়েকদিন হল সামনের ফ্ল্যাটের তিন তলায় তিনটে নাইজেরিয়ান ভাড়া নিয়ে এসেছে।  দানবের মত চেহারা,গায়ের রঙ মিশকালো। কলকাতায় এখন এই নাইজেরিয়ান গুলোকে নিয়ে আসে আর একটু ট্রেনিং দিয়ে ফুটবল মাঠে নামিয়ে দেয়। অমানুষিক শক্তি এদের। আমাদের ভারতীয়রা এদের সাথে পেরে ওঠে না। তাই একটা ফুটবল টিমে একটি এই দানব থাকলে তো চিন্তাই নেই। তবে ওদের ঐচেহারা সাধারণ মানুষের ভীতির কারণ। এমনিতে নাইজেরিয়া দেশটা খুব গরীব। বিশ্বের বহুদেশ তাদের গায়ের রঙের গরিমায় এদেরকে অত্যন্ত নিম্নমানের কাজে নিজুক্ত করে। সেই অভিমানেই এরা বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। আর  সাধারন মানুষ এইকারনে এদেরকে বেশ ভয়ের চোখেই দেখি। এইসব চিন্তায় যখন মগ্ন রিমা দেখলো সামনের ফ্ল্যটের এদিকের জানলাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। রিমা মনে মনে বেশ অবাকই হল। ভেবেছিল ওরা ইচ্ছাকরে হয়তো এদিকের জানলা খুলে রাখে রিমাকে দেখার জন্য।

পরেরদিন আবার রিমা জানলা খোলার কিছুক্ষণ  পরে ওদের জানলা বন্ধ হয়ে গেল।  আহা!ন্যাকামি! ভালোমানুষি দেখানো হচ্ছে!তোমাদের শয়তানি যেন বুঝিনা!এইভাবে মাস ছয়েক কেটে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও ওদের কোনও শয়তানি রিমা আবিস্কার করতে পারেনি। নিজের কাজের থেকে বেশী ওদের ওপর নজর রাখে রিমা। একটা সময় নিজের রোজকার কাজে ডুবে গেল রিমা। ওদের কথা ভুলেও গেল।

এরমধ্যে একদিন হঠাৎ  দীপ্তর প্রচন্ড জ্বর এলো।সারারাত  ছটফট করে ভোরবেলা রিমাকে ডেকে তোলে “বাড়ীতে ক্রোসিন থাকলে দাও”।  রিমা গায়ে হাত দিয়ে দেখে গা পুড়ে যাচ্ছে। ক্রোসিনও আছে মাত্র একটা। আপাততঃ সেটাই দিল দীপ্তকে। বেলার দিকে বেড়িয়ে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু চিন্তার বিষয় এটাই যে আজ বন্ধ্!
সকাল ন’টার দিকে আবার তরতরিয়ে জ্বর উঠতে শুরু করলো। থার্মোমিটারে ১০৩ ছুঁইছুঁই। দীপ্ত ভুল বকতে শুরু করেছে। আর ঘরে বসে থাকা যায়না। ডঃরায়চৌধুরির ফোন অফ। বড়রাস্তার কোনদিকে ওনার বাড়ী রিমার জানা। বাড়ী থেকে আনার জন্য বেড়ীয়ে পড়লো রীমা। অনেক কষ্টে একটা রিকসাও পেয়ে গেল। কিন্তু সে বড় রাস্তা যাবেনা সেখানে ঝামেলা হচ্ছে। কিন্তু রিমাকে তো যেতেই হবে। বড় রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দুরে রিক্সাওলা থেমে গেল। ভাড়া মিটিয়ে রিমা এগিয়ে চলল। কাছাকাছি যেতেই দুটো চ্যাংরা ছেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো “ কি ব্যাপার?” সবশুনে ওরা সড়ে রিমার যাওয়ার রাস্তা করে দিল। ঠিক তখনই বিরোধী পক্ষের পতাকা লাগানো একটা গাড়ি ঢুকতেই বেঁধে গেল গোলযোগ। দুই পক্ষের মারামারির মাঝখানে পরে দিশেহারা। ঠিক সেই সময় একটা ছেলে তেড়ে এল ওর দিকে। রিমা চোখ বুজে ফেলল ভয়ে। আজ বোধহয় সে বাঁচবে না। ঠিক সেই সময়ই একটা  দানব লাফিয়ে পড়লো সামনে। ওর বিশাল চেহারা দেখে ছেলেটা থমকে গেল। দানবটা একটা হুংকার দিতেই ছেলেটা উলটো দিকে দৌড় লাগাল। দানবটা এক ঝটকায় রিমাকে সোজা করে দাঁড় করালো।  রিমা ভালোকরে তাকিয়ে দেখলো এত ওদের সামনের ফ্লাটের সেই তিনটে দানবের একটা!। বাকী দুটো একটু দুরে দাঁড়ানো। রিমা উঠে দাঁড়াতে বাকী দুটো এগিয়ে এল। রিমার পরিত্রাতা ধমকে উঠলো “হোয়াৎ আর ইউ দুয়িং হেয়ার ইন দিচ ক্যায়োচ”। রিমা অসহায়ের মত তার কথা জানালো। পরিত্রাতা তার স্বজাতিকে নিজস্ব ভাষায় সব বলল। ওরা তার উত্তরে কিছু বলতেই সে প্রশ্ন করলো,“হোয়্যার ইজ ইয়োর ডক্তর”। রিমা ইসারায় দেখাতেই সে বলল “লেতচ গো”। ডাঃ রায়চৌধুরি দানবগুলোকে দেখেই বোধহয় আর প্রতিবাদ করলেন না। ওরা বাড়ী পর্য্যন্ত পিছু পিছু এল। যাবার সময় একটা কাগজে লেখা মোবাইল  নাম্বার দিয়ে ইশারায় বলল দরকারহলে যেন ফোন করে রিমা। কোনও উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওরা চলে গেল।

Monday, 24 October 2016

কুকুর-কাহিনী

প্রত্যেক পাড়ায় একটা-দুটো শুটকো ছেলে থাকে যারা পাড়ার মা-বোনেদের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়। উটকো ছেলে পাড়ায় ঢুকলে সরু লিকপিকে চেহারা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিশাল বড় বড় বাতেল্লা ঝারে। কিন্তু প্রতিপক্ষ একবার চোখ কুচকালেই কিন্তু প্রাণপাখি ডানা মেলে।

আমাদের পাড়ার ঠিক এইরকম দুটি চ্যাংরা কুকুর আছে। কুকুর মানে কিন্তু আমি চতুস্পদ প্রাণী ‘ডগ’এর কথাই বলছি। একটা কালো একটা সাদা। চ্যাংরা এইকারনেই বলছি, পাড়ার মুদিদোকান থেকে বেড়োলেই পিছন পিছন হাটতে থাকবে যতক্ষন না বাড়ীর গেট খুলে ঢুকি। বারান্দায় দাঁড়ালে হাঁ করে উপর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

কোনও কুকুর যদি পাড়া দিয়ে ‘পাস’ করে তো শুরু হয়ে যাবে ওর ঘৌঘৌ। আর একবার যদি শুরু করলো তো যতক্ষণ না লাঠি নিয়ে তেড়ে যাব ততক্ষণ ঘৌঘৌ করেই যাবে। একদিন মাঝরাতে ঠিক আমরই জানলার নীচে শুরু করেছে ওর পোঁ। কিছুতেই আর থামেনা, একঘন্টার ওপর হয়ে গেছে ঘৌঘৌ করেই চলেছে। বাবুই রেগেমেগে খাটে উঠে বসে বলল,“মনে হচ্ছে ওর পিছনে ক্যাৎ করে এক লাথ মারি”। আমি আর বাবুই নীচে লাঠি নিয়ে নেমে এলাম। লাঠি দেখে চোঁ চাঁ দৌড় দিয়ে পগাড় পার। মনে মনে বললাম ‘বাঁচা গেল’। বেশ কিছুদিন চুপচাপ।

দিন পনেরো বাদে আবার রাত্রিবেলা এক কিস্সা। কিছুক্ষণ  চলার পর পাশ থেকে বাবুইয়ের বিরক্তিসূচক  নানা আওয়াজ কানে আসতে লাগলো। উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখি কেউ কোথ্থাও নেই।  ওটা বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে ডেকেই চলেছে। আমি ঘরে এলাম এক বালতি জল উপর থেকে দিলাম ফেলে। বেশীরভাগ টাই পড়লো রাস্তায়। গরমকাল ছিল বলেই জল থেরাপি কাজে লাগাতে পেরেছি। যাইহোক সে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালালো।

এখন ওর ঘৌঘৌয়ের ব্যামো চাপলে আমি বারান্দায় গিয়ে দাড়াই। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে ‘ভোক-ভোক’ করে তারপর আস্তে আস্তে চলে যায়।

ছোটবেলা থেকে আমি কুকুরকে খুব ভয় পেতাম। কিন্তু দেখা গেল আমার যে বাড়ীতে বিয়ে ঠিক হল সে বাড়ীর অন্যতম মেম্বার একটি জার্মান স্পিৎজ। শুনলাম কুকুরটি আমার সদ্য গত হওয়া হবু শ্বাশুরি মায়ের খুব কাছের। শ্বাশুরি মা চলে যাবার পর সে এখন আমার হবু স্বামী মানে রাজার খুব কাছের। ক্রমশ আমার বিয়ের দিন এগিয়ে আসতে লাগল আর আমার আতঙ্ক বাড়তে লাগল। এইসবের মধ্যে আমার বিয়েও হয়ে গেল। বিয়ের পরের দিন যখন শ্বশুর বাড়ী গেলাম,সমস্ত আচার অনুস্ঠানের পর আমার শ্বশুরমশাই কুকুরটিকে আমার সাথে আলাপ করাতে নিয়ে এলেন। তখন জানলাম ওর নাম ‘ভিকি’। ভিকি আমায় শুঁকলো,পায়ের আঙ্গুল চাটলো চলে গেল। আমি জানিনা ভিকি আমাকে কিভাবে নিল কিন্তু আমি ওর সামনে রাজাকে ছুঁতাম না,এই ভয়ে যে ও যদি রিঅ্যাকট করে! ভিকি কিন্তু সব সময় আমার পিছন পিছন ঘুরতো। আমি খেতে বসলে ও চেয়ারের তলায় বসে থাকত আমি শুতে গেলে আমার খাটের তলায় শুয়ে থাকতো। আমার শ্বশুর মশাইয়ের সংগে আমার বিভিন্ন কারনে বাগবিতণ্ডা হত। উনি আক্রমনাত্মক হলেই ভিকি তেড়ে যেত। এরপর এমন হল উনি আমার কাছাকাছি থাকলেই ভিকি তেড়ে যেত। একবার দুপুরে হঠাৎ  কালবৈশাখী ঝড় উঠল। প্রবল বাজ পড়ছিল।ঘুম একটু হালকা হতেই টের পেলাম ভিকি আমার কোমড়ে ঠেস দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। সেই প্রথম ওকে আমি বিছানায় উঠতে দেখেছিলাম। এইভাবে ওর সাথে আমার সখ্যতা হয়েগিয়েছিল। আমি কম্পিউটার  ইন্সটিটিউট যেতাম। বিকেলে ফিরে দেখতাম ও আমার জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছে। ও নাকি ঠিক আমার আসার সময় হলেই বারান্দায় গিয়ে বসে থাকত। এইভাবে দুবছর চলল। একদিন সকাল ঘুম থেকে উঠে দেখি ও খুব কাঁপছে। সময়টা ছিল জানুয়ারি মাস ৮তারিখ।  আমি রাজাকে ডেকে তুললাম। রাজা ঘুম থেকে উঠলে ও যে ভাবে রিঅ্যাকট করতো তার কিছুই করল না। সেদিন রবিবার ছিল তাই রাজা আডডা দিতে চলে গেল। যাবার আগে ওকে ছাদে বিছানা পেতে হালকা রোদে শুইয়ে রেখে গেল। আমি বসেরইলাম সামনে যদি ও জল-টল কিছু চায়। ছাদৈ কাক বসলে ও তেড়ে যেত সেদিন কাকে ওর ল্যাজ টানছিল পা টানছিল ও কিচ্ছু বলছিল না। বঝতে পারছিলাম ওর সময় আগত। আমি কাকগুলো তাড়িয়ে রাজাকে ফোন করলাম, তুমি শিগগিরি এসো আমার ভালো ঠেকছেনা। রাজা একটু পরেই দৌড়তে দৌড়তে এল। ছাদে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল“কি হয়েছে মা,কষ্ট হচ্ছে?” কথা শেষ হতেই ভিকি রাজার হাতের কড়ে আঙ্গুলটা হালকা করে মুখে নিল। কিন্তু দাঁত চেপে বসল রাজার আঙ্গুলে। ভিকি আর নেই! যেই রাজাকে ও কারও সাথে সেয়ার করতে চাইত না, যার কাছে ও দুবেলা খেত,খুনসুটি করত, তার কাছ থেকে শেষ বিদায় টা নিয়েই ভিকি চলে গেল।

Sunday, 23 October 2016

সুখ

শিউলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল অন্যমনস্কভাবে। পিউ পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো,“মা আমরা কখন ঠাকুর দেখতে যাব,বাবা কখন আসবে!একটা হোয়াটস অ্যাপ করো না,দেখোনা কোথায় আছে”।
সে কি আর করেনি শিউলি!কিন্তু ম্যাসেজ ডেলিভারই হয়নি। তার মানে ফোন অফ করা। আজ ষস্টি। আজই সবাই ঠাকুর দেখতে বেরচ্ছে। পিউকে রুদ্র বলে গেছে অফিস থেকে এসেই বেরোবে।  কিন্তু এখনও কোনও খবর নেই। অস্থির পায়ে এসে ঘরে বসলো শিউলি। পিউকে একটু জল দিতে বলতেই ডোরবেল বেজে উঠল। পিউ দরজা খুলতেই ধীর পায় মাথা নীচু করে ঢুকলো রুদ্র। ধপাস্ করে সোফায় বসে বলল ““আর চাকরি নেই””

ঘরের মধ্যে যেন পারমাণবিক বোমা পড়ল। শিউলি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রুদ্র বলল,“ওরা আমার কোনও কথাই শুনলো না,শুধু বলল আর আসতে হবে না। কি কারণ কিছুই বলল না”হতাশ গলায় বলল রুদ্র। পিউ হঠাৎ এই খবর আশা করেনি। বিস্ফরিত চোখে বাবার হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। খানিকটা হতাশা,খানিকটা ভয় আর খানিকটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক সেই দৃষ্টিতে ছিল। আশা শিউলীও করেনি কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু মনে হচ্ছিল এই আবহাত্তয়া ঠিক করা একান্ত দরকার। যা হবার তো হয়ে গেছে। অবশ্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত সেও। কিন্তু ভেবে কিহবে,যা হবে তা ফেস করবো—করতেই হবে!সারাটা বছর এই কটা দিনের অপেক্ষায় বসে থাকা, সারাটা বছর একটু একটু করে তৈরী হওয়া সমস্ত কিছু পন্ড হতে দেওয়া যায় না। রুদ্র বহুবার ‘বেস্ট সেলার’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। চাকরী ছাড়া ও থাকবেনা শিউলি জানে। রুদ্রকে সব কোম্পানি ডেকে নিয়ে গেছে। তবে চিন্তা কি!
শিউলি উঠে গিয়ে চা বসালো। রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়ালে রুদ্র অসহায়ের মত তাকালো শিউলির দিকে।
“আরে তুমি এত হতাশ হচ্ছ কেন!ভুভারতে কি এছাড়া আর কোনও সেলস্ এর জব নেই।” রুদ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শিউলির মুখের দিকে। “আরে বাবা মনে করনা এটা তোমার পূজা বিরতি!” রুদ্রর মুখ ধীরে ধীরে নর্ম্যাল হতে শুরু করেছে। “তোমাকে আমরা কতটুকু পাই বল!এই ছুতোয় তোমাকে আমরা একটু কাছে পাব। বেড়াব আনন্দ করবো”রুদ্রর মুখ ঝলমল করে উঠলো। ওদিকে চায়ের জল ফুটতে শুরু করেছে। শিউলি উঠে গেল।
চা নিয়ে যখন আবার ড্রইংরুমে ঢুকল আবহাওয়া  বদলে গেছে। রুদ্রকে পিউ মোবাইল  অন করে পূজার ম্যাপ দেখাচ্ছিল অ্যাপ খুলে।
“কিন্তু শিউলি সংসার চলবে কিকরে!” হাতে চা নিয়ে রুদ্র বলল।
“কেন?আমরা কি দিন আনি দিন খাই নাকি? সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা আছে। দরকার পড়লে ফিকস্ট ভেঙ্গে অল্প নিয়ে আবার ফিকস্ট করে দেবো। অত ভেবনা। ভেবে কিছু হাল বেরোবেনা। জব তুমি ঠিক পেয়ে যাবে। যাও ফ্রেস হয়ে নাও,জামা প্যান্ট বার করে দিচ্ছি”।
পিউয়ের ঘর থেকে তখন পিউয়ের গলা পাওয়া যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে পূজোর প্যানিং নিয়ে কথা চলছে।

Saturday, 22 October 2016

রাধা

 

““বাঁচাও”” চিৎকার টা শুনে আমি থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর ঠিক তখনই সামনে এসে হুমরি খেয়ে পরলো  মোরের মাথায় ধুপকাঠি বিক্রী করা মেয়টি। আমি প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। পরক্ষণেই মনে হলো এখান থেকে মেয়েটিকে সড়ানো দরকার। একটা অটো ডেকে উঠে পরলাম দুজনে। অটোতে যেতে যা শুনলাম তাতে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় আরকি! মেয়েটির নাম রাধা। এসেছে উত্তরপ্রদেশ থেকে। বাড়ীতে তিন ভাই বোন,মা আর পঙ্গু বাবা। একমাস আগে ওদের গ্রামের একটি ছেলে ,যে এখানে কাজ করে ,তার সাথে কোলকাতা আসে। কিন্তু রাধা জানতো না যে ছেলেটি এখানকার কাজ আসলে চুরি করা।হাওড়াতে নামার সাথে সাথে ছেলেটিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিন বছরেরে জন্য সে এখন শ্রীঘরে। ছেলেটির এই অবস্থা হওয়াতে রাধা মুশকিলে  পরে গেল। ওর কাছে ফিরে যাবারও পয়সা ছিলনা। দুদিন শুধু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে। তারপর একজন ধুপকাঠির হোলসেলার ওকে এইকাজ দেয়। প্রতি প্যাকেটে ৫০পয়সা কমিশন। ভালোই চলছিল। কিন্তু গত চারদিন ধরে তিনটি ছেলে ওকে উতক্ত করছে। আজ তো ওকে জোর করে ট্যাক্সিতে তুলছিল, ও কোনও রকমে পালিয়ে বেঁচেছে। 

কথা শেষকরে হুমরি খেয়ে আমার পায়ের ওপর পড়লো মেয়েটা, “দিদি গো আমায় বাঁচাও। আমাকে যেকোনও একটা কাজ দাও। আমি তোমার ঘরের সব কাজ করে দেব।” আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম। ওরয়ে গেল আমার বাড়ীতে। আমার ঠিকা কাজের লোক ছিল। বহুদিন ধরে একটা রান্নার লোক খুঁজছিলাম। রান্নার হাতটা বেশ। আমাদের কিছু রান্নাও ওকে শিখিয়ে নিলাম। ও আসাতে আমার বুটিকের কাজেও আমি বেশ মন দিতে পারছিলাম। আমার শ্বাশুরীও বেশ খুশী। রাধাও খুশী। কদিনেই আমার বাড়ীর লোকের চোখের মনি হয়ে উঠল রাধা। 

একদিন.........

রাতে বাড়ী ফিরেছি। রাধা রাতের খাবার তৈরীতে ব্যস্ত। আমি জল খেতে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি আটা মাখার থালাটার ওপর একটা সুন্দর মুর্তি বসানো। ভালো করে দেখে বুঝলাম আটাটাকে মেখে একটা পুতুল তৈরী করে রেখেছে। ব্যাপারটা আমার মজার আর ইন্টারেস্টিং লাগল। পরেরদিন আবার ওর রুটি করার আগে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখি আর একটা অন্য পুতুল বানিয়ে রেখেছে। এই বেশকিছুদিন লক্ষ্য করলাম প্রত্যেকদিনই কিছুনাকিছু ও বানিয়ে রাখে। ওকে জিগ্গেস করে জানলাম ওর বাবা মাটির পুতুল বানাতেন। সেখান থেকেই ও শিখেছিল। আমি জিগ্গেস করলাম,“তোকে মাটি এনেদিলে তুই পুতুল তৈরী করতে পারবি?”। রাধা এতই অবাক হয়ে গেল যে ওর মুখটা হা হয়ে গেল। কি্তু ওর পরের প্রশ্নে আমার হা হবার পালা। ওবলল,“আমায় তাড়িয়ে দেবে নাতো!”

এরপর একটা বছর হুড়হুড় করে কেটে গেল। এগ্জিবিশন আর এগ্জিবিশন। রাধার মুর্তি পুতুল ফুলদানি বিদেশে যাচ্ছে। নিঃসহায় মহিলাদের ট্রেনিং দেয় ও। অনেক মানুষকে সাহায্য করে। আজ ওর অফিসে ওর অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে পুরোনো কথাগুলো এই ভাবেই মনে পরে গেল।

হঠাৎ  সেদিন


আমি সাউথ সিটির ওপরের করিডোরে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথমেই ঢুকলো স্বাগতা। স্বাগতা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত। আমি ব্যাগে হাত দিতে যাব ফোনটা বার করার জন্য ঠিক তখনই নীলাঞ্জন আর শৈবাল এক সাথেই ঢুকলো। আমি মজা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওরা দুজনেই একসাথে স্বাগতাকে ডেকে উঠলো। নীল ফোন বার করছে, আমিও ফোনটা বার করে হাতে নিলাম। সাথেসাথে ফোনটা বেজে উঠলো, “ওপরের রেস্ট্রুরেন্টে চলে আয়। আমি ওয়েট করছি”

স্কুলের চার বন্ধু ফেসবুকের কল্যানে ৪২বছর বয়সে আবার নতুনকরে বন্ধু হয়েছি। আমি,স্বাগতা আর শৈবালের দেখা করাটা কোনও ব্যাপার ছিলনা। চিন্তা ছিল নীলকে নিয়ে। ও থাকে ইউকে। আসবো বললেই আসা যায়না। কিন্তু সে অসাধ্য সাধনও হল,নীল এল। শৈবালকে দেখেই নীলের চোয়াল শক্ত হয়েগিয়েছিল। শৈবালকে ডাকতে বারন করেছিল নীল কিন্তু আমি না ডেকে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল শৈবালের পরিবর্তনটা নীল নিজের চোখে দেখুক। শৈবালের পাশে আজ নীলেরই দাঁড়ানো উচিত। শৈবাল আজ সবচেয়ে একা। শৈবালও বোধহয় তাই চাইছিল। শৈবাল নিজে বসে আর একটাচেয়ার নীলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,“বস”। নীল ঘুরে আমার পাশের চেয়ারে এসে বসলো। কেউই কোনও কথা বলছেনা সকলের মনেই একে অন্যের প্রতি বহুবছর আগের বিদ্বেষ যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। আমি শৈবালকে জিগ্গেস করলাম “তোর শরীরের অবস্থা তো খুব খারাপ। রোগা হয়ে গেছিস, চোখের তলায় তো কালিও পরেছে!ডাক্তার কি বলল,রিপোর্টগুলো করিয়েছিস?”। আমার কথা শুনে নীল আর স্বাগতা মাথা নীচু করে থাকা শৈবালের দিকে তাকালো। ওদের ভাবখানা এই যে ‘যাক কেউ একজন কথা তো শুরু করলো’। “রিপোর্ট পজেটিভ” শৈবাল মুখ না তুলেই উত্তর দিল। সাথেসাথেই নীল আর স্বাগতার মুখে একরাশ বিষ্ময় মুখ দিয়ে সমবেত হয়ে বেরোলো, “মানে কী হয়েছে তোর”। দুজনেই অপার বিষ্ময়ে আমার দিকে একবার,একবার শৈবালের দিকে তাকালো। হ্যাঁ আমি জানতাম,বলিনি, চেয়েছিলাম শৈবাল নিজেই বলুক। 

“আমি এইচ-আই-ভি পজেটিভ”। ধারেকাছে  কোথাও বিকট জোরে বাজ পরলো। ক্ষনিকের জন্য গোটা সাউথসিটি মলটাই যেন থমকে গেল। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে বাজটা পরলো তাতে আমাদের স্বাভাবিক হবার জন্য বোধহয় শৈবালের পরবর্তী কথাগুলোই দরকার ছিল। “মাসছয়েক আগে একটা কার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। প্রচুর ব্লাড লেগেছিল। তার মধ্যেই আমার মৃত্যুর পরোয়ানা ছিল”। শৈবালের কথা শেষ হতেই স্বাগতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। নীল যেন কঁকিয়ে উঠলো,“এ তুই কি বলছিস!” নীল চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ছোটবেলার প্রানের বন্ধুকে, “আমায় ক্ষমা করে দে।আমি বুঝিনি কেন লালি আজকে এখানে আসার জন্য দিব্যি দিয়েছিল”। শৈবাল চোখ মুছে হেসে বলল,“তুই আবার কবে থেকে দিব্যি মানতে শুরু করলি”। নীল চোখ মুছতে মুছতে বলল,“এখন আমার সব মানতে ইচ্ছা করে রে।হয়তো স্বাভাবিকতা টা মানলে আজ আর এই কষ্টটা পেতামনা”। 

শৈবাল স্বাগতার মাথায় হাত বোলায়। “তুই আগে কেন বলিস নি!” অনুযোগ করে স্বাগতা। “আগে জানলে কি করতি,  আমার ভালোবাসা অ্যাকসেপ্ট করে নিতি?” শৈবালের কথায় চুপ করে যায় স্বাগতা। হঠাৎ  ধীর গলায় বলে ওঠে “হয়তো নিতাম!”।  শৈবাল স্কুল থেকে স্বাগতা ভালোবাসতো কিন্তু স্বাগতা শৈবালকে এড়িয়ে চলতো। শৈবাল কোনদিনও মুখফুটে স্বাগতাকে বলেনি যে ও স্বাগতাকে ভালোবাসতো কিনতু আমরা সক্কলে একথা জানতাম। স্বাগতার কথায় আমরা তিনজনেই চমকে উঠলাম। আমি প্রায় চিৎকার করেই বললাম “তুই ম্যারেড ভুলে গেলি নাকি”। ও খুব শান্ত আর দৃঢ় স্বরে বলল “কিচ্ছু ভুলিনি। কাউকে যদি আমি ভালোবাসি তার মানে কি আমি আমার স্বামীকে চিট্ করছি! আমি যদি শৈবালকে ভালোবাসি, ওর সাথে ফোনে কথা বলি,চ্যাট করি তাহলে কি আমার স্বামীকে চিট্ করা হয়! লালি, আমি তোকেও খুব ভালোবাসি। তার মানে কি আমি আমার স্বামীকে চিট করছি?” নীলের তখনও বিষ্ময় কাটেনি,বলল,“কিন্তু এ কেমন ভালোবাসা!” স্বাগতা যেন এক বিদ্রোহী। একটানে সমস্ত নিয়মকানুন উলোটপালট করে দেবে,বলল,“কেন! ভালোবাসা মানেই কি শরীর ছুঁয়ে থাকতে হবে মন ছুঁয়ে কি থাকা যায়না? ভালোবাসা মানেই কি বিয়ে করে সংসার পাততে হবে? ভালোবাসা একটা অনুভুতি। আমার স্বামী আছে বলে সে অনুভুতি কখনই হবে না এরকম তো কথা কখনই থাকতে পারেনা! নীল,লালি বিবাহিত জেনে কি তোর কি লালিরষপ্রতি ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে নাকি লালি বিবাহিত বলে তোকে এখনও ভালোবাসেনা?” এই কথাটারষজন্য আমরা দুজনেই প্রস্তুত ছিলাম না। নীল বলে উঠলো “বাজে কথা রাখ”। স্বাগতা হেসে বলল,“ বাজে কথা!  তুই তো দিব্যি-টিব্যি মানিস না তাহলে আজ লালির দিব্যি মেনে এলি কেন? আর লালিই বা কিসের জোরে বলল ‘নীল আসবেই’,যেখানে আমরা সবাই জানি তোর সাথে শৈবালের মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল!”

আমরা উঠে পরলাম।  আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছিল। শৈবালের হারিয়ে যাওয়া সবকিছু  আমি ওর জীবনের শেষ সময়ে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। আমাদের জীবনে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা বন্ধুত্ব ফিরে এল কিনা জানি না কিন্তু শৈবালকে দিতে পেরে আমরা সকলেই অনাবিল আনন্দের অধিকারী হলাম। 

দেখা


খুব আশ্চর্যজনক ভাবে  একটা মলে দেখা হয়ে গেল তুষারের সাথে। আমি মেয়েকে ওর বন্ধুর বাড়ীতে নামিয়ে দিয়ে লেকমলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ  পরিচিত একটা ডাক ‘ওই’ শুনে পিছন ঘুরে দেখি ও। ও আমাকে নাম ধরে ডাকতো না।  ঐ ‘ওই’ বলেই ডাকতো। ওর সাথে আমিও অবাক হলাম যে এখনও ডাকটা ভুলিনি। আমার থেকে ৯বছরের ছোট ছিল দেখে মনে হচ্ছে আমার থেকে ৯বছরের বড়। চুল পেকে গেছে। চেহারাটাও সামান্য ভারী হয়েছে। কিন্তু চোখের সেই চাউনি এখনও আগের মতই। আমি বললাম, “আমি বুঝতে পারছি না আমার কিভাবে রিআ্যাক্ট করা উচিত”। কারণ শেষের দিকে সম্পর্কটা খুব তিক্ত হয়েগিয়েছিল।আমি ওকে বুঝিয়েছিলাম,আমি বিবাহিত। আমার সাথে সম্পর্ক রাখলে ওর কষ্ট শুধুই বাড়বে। ওজীবনে থিতু হতে পারবেনা।  ও আগের মতই হাহা করে হেসে বলল,“তুই এখনও আগের মত পাগলীই আছিস! তুই যেমন ইচ্ছা বিহেব কর আমি মাথা পেতে নেব”।খুব খারাপ ব্যবহার করে আমাকে মানষিক ভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে ও চলে গিয়েছিল। হয়ত আমার প্রতিশোধ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পারিনি! ও-ও কোলকাতা ছেড়ে,কোলকাতার সব কনটাক্টস্ ছেড়ে চলে গিয়েছিল গুঁরগাও।   শুনলাম ও মেট্রো স্টেশন থেকে আমায় ফলো করছে। বললাম ,“জানিস কোনও মহিলাকে ফলো করা অনৈতিক!” ও আবার সেইরকম করেই হাসলো। আমরা ওপরের রেস্ট্রোরেন্টটায় গিয়ে বসলাম। জিগ্গেস করলাম বউ মেয়ের কথা। চকিতে গম্ভীর হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার বিয়ে করাটাই ঠিক হয়নি জানিস। তোর ওপর অভিমান করে তড়িঘড়ি বিয়েটা করেছিলাম। ভেবেছিলাম তোকে দেখিয়ে দেবো তোকে ছাড়াও আমি সুখী হতে পারি”। তুষার থামলো। আমি ভয়ে ভয়ে  ওর নীচু করে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “পেরেছিস সুখী হতে?”। হট্ করে মুখটা তুলল। মুখে সেই স্বভাবসিদ্ধ স্মিত হাসি কিন্তু চোখ ছলছলে,“সুখী হলে কি আজ আমি এখানে আসতাম? বউকে আপ্রাণ চেষ্টা করি ভালো রাখতে। কিন্তু মেয়েতো,ঠিক বুঝে যায়,আমি অভিনয় করছি। ঠিক যেভাবে তুই আমার সবকিছু বুঝে যেতি।”

এইভাবে অনেক কথা হল। যাবার সময় বল্লাম,“আমি ভেবেছিলাম তুই আমায় ভুলে গেছিস!” ও অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,“একবার যে তোর সাথে মিশেছে সে তোকে ভালো নাবেসে,ভুলে থাকতে পারবেনা রে বোকা। তুই নিজেই তোর তুলনা”। লিফটে উঠে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তারপর বলল,“আমায় ক্ষমা করে দিস আমি তোকে ভুলতে পারলাম না বলে”।  লিফটের দরজাটা খুলে গেল সাথসাথে। আর ও বেরিয়ে,“চলিরে” বলে কোথায় হারিয়ে গেল।  আমিও আর খুঁজলাম না। বোধহয় ও হারিয়ে যাওয়াই দুজনের পক্ষে ভালো।