Saturday, 22 October 2016

ভুলে থাকা সম্পর্ক

অনেক বছর আগের কথা,বলতে গেলে আমাদের মা বাবাদের ছোটবেলা। ক্ষীরোদ দত্ত আদ্রা রেলে চাকরি করতেন। তিনটি ছেলে ও একটি মেয়ে আর স্ত্রী রাধাকে নিয়ে সংসার। যেটুকু আয় তার পুরোটাই চলে যেত সংসারে,কিছু জমানো তো দূরে থাক রাধাকে একটা ঠিকে কাজের লোকের সুখও দিতে পারেন নি ক্ষীরোদ। এই অভাবের সংসারে এসে পড়ল মা-বাপ মরা বোনের মেয়ে রত্না। রাধার বিরক্তি ছিল অনেক কারন পাঁচজনের মুখে ভাত যোগান দিতে দিতেই হত দরিদ্র এর মধ্যে আবার আর একজন! শুরু হল রত্নাকে দিয়ে যাবতীয় কাজ করানো। রত্না মুখবুজে সব করত। ক্ষীরোদের বড় ছেলে যতিনের বোঝার বয়স হয়েছিল। রত্নাকে এইভাবে খাটতে দেখে তার কষ্ট হত কিন্তু রাধার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তো ক্ষীরোদেরই হতনা তো যতিন বলে কিকরে। রাধা ইচ্ছাকরে রত্নাকে কম খেতে দিত যাতে রত্না আর একটু চায় আর রাধা মনের সুখে বকাবকি   করবে।  কিনতু রত্না সে সুযোগ দিতনা হে আর ভাত চাইত না। রাধা পরেরদিন আরও কম দিত কিন্তু রত্না কীছুতেই চাইতনা। এইভাবে চলতে চলতে একদিন রত্না পালিয়ে গেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল একটি ছেলের সাথে সে চলে গেছে। ক্ষীরোদের মন মানতে চাইল না। রত্নাকে সে বাড়ী ফিরিয়ে আনতে চাইল কিন্তু রাধা তার নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের দোহাই দিয়ে ক্ষীরোদকে বাধা দিল। ক্ষীরোদ কিনতু ভুলতে পারলনা রত্নার কথা। একটা অপরাধবোধ কাজ করত সবসময়।

এরপর বহুবছর কেটে গেছে। যতিনের মেয়ে তখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পরাশোনা করে। একদিন চুপিচুপি ক্ষীরোদ তাকে ডাকলো। বলল,আমার একটা কাজ করে দিবি? নিজের ডাইরির  পাতার ফাঁক থেকে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ বার করে বলল, একে একটু আমার কাছে নিয়ে আসবি? যতিনের মেয়ে রিনি অনেক কষ্টে সেই লেখা পাঠোদ্ধার করে বুঝলো সেটা যাদবপুরের ঠিকানা। যার ঠিকানা তার নাম রত্নাসেন। রিনি ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে দেখলো সেখানে সে ঠিকানার অস্তিত্বই নেই! কিকরা যায়। ছোটবেলা থেকে এই রত্না নামের ভদ্রমহিলার কথা এত শুনেছে যে জেদ চেপে গেল। এবার নাম ধরে খুঁজতে শুরু করল। একদিন একজন সৌম্যকান্তি ভ্দ্রলোক জিগ্গেস করলেন, এই মহিলা আপনার কে হন। রিনি বলল,উনি আমার পিসি। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ রিনির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিগ্গেস করলেন, তুমি কি যতিনের মেয়ে? এস আমার সাথে। ভদ্রলোক একটা দামী গাড়ীতে উঠলেন। রিনির মনে এখন একটাই প্রশ্ন ইনিই কি সেই হিরো যে পিসিকে রক্ষা করেছিলেন!ভদ্রলোক গাড়িতেই একজনকে ফোন করলেন, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। তুমি ভাবতে থাকো আমি নিয়ে আসছি। গাড়ী এসে দাঁড়ালো একটা সুন্দর তিনতলা বাড়ীর সামনে। দরজা খুলে বেড়লেন এক হাস্যময়ী ঝকঝকে প্রৌঢ়া। রিনিকে দেখে থমকে গেলেন। স্বামীকে জিগ্গেস করলেন ,কে ও? স্বামী মিটিমিটি হেসে বললেন, বলতো কে? তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এসেছে আমারই কাছে! চিনতে পারলেনা তো! তোমার ভাই যতিনের মেয়ে গো! রিনি ততক্ষণে ঢিপ করে প্রণাম করে ফেলেছে। রত্না ছলছলে চোখে জড়িয়ে ধরলো। তারপর চলল খাওয়া দাওয়া। একেএকে সবার খোজ নিলো রত্না। যাবার সময় রিনি বলল,পিসি দাদু তোমার জন্য খুব মন খারাপ করে তুমি একবারটি চলো। রত্না সস্নেহে রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,নারে সোনা আমি যাবনা।  আমি গিয়ে সামনে দাঁড়ালে মামার অপরাধ বোধ আরও বাড়বে। এই বুড়ো বয়সে আমি ওনাকে আর কষ্ট দিতে চাইনা। তুই আমার একটা কাজ করবি সোনা?আমার সাথে তোর যে দেখা হয়েছে একথা মামাকে বলিসনা। মামা জানুক যে আমি হারিয়ে গেছি। রিনি ওর মানিব্যাগ খুলে দাদুর ছবিটা রত্নার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,নাইবা গেল ভাগনি মামার কাছে। মামা তো এল!

নতুন জীবন

আজ দীপার ফিরতে বেশ দেরিই হয়েছে।  চটি খুলতে খুলতে আড়চোখে বাবাকে একবার দেখে নিল দীপা। রেগে আছে কিনা বোঝা গেলনা,সংবাদপত্রের দিকে চোখ। রান্নাঘর থেকে মা বলল “দীপা হাত মুখ ধুয়ে টবিলে বোস  খাবার বাড়ছি”।  বাবা গম্ভীর গলায় বলল,“ না কাপড় ছেড়ে আসুক। তোমরা মা মেয়েতে তো আমার কোনও কথাই শোনোনা অন্তত এই নিয়মটাতো মানো”। বাবার রাগ করাটা সঙ্গত।  গত পরশুও মোড়ের মাথায় একটি মেয়ের ওরনা ধরে টেনেছে একদল ছেলে। পুলিশকে কিছু জানায়নি বাড়ীর লোক। এসব ক্ষেত্রে যা হয় পাড়া প্রতিবেশী “মেয়েটাই খারাপ” এই জাতীয় মন্তব্য করে মেয়েটার বাড়ীর সকলকে একঘরে করে দিয়েছে।
আজ নিলাদ্রীর সাথে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল দীপা। অফিস থেকে তাড়াতাড়িই বেড়িয়েছিল কিন্ত ডাক্তারের চেম্বারে ভীড় ছিল। আজ ডাক্তারের কথায় নিলাদ্রীর মন ভেঙ্গে গেছে। কথা শুনে মনে হল কোনও আশা নেই। নিলাদ্রী কোনও দিনই বাবা হতে পারবেনা। নিলাদ্রী একদিকে কষ্ট পাচ্ছে দীপাকে বিয়ে করলে দীপা মা হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে অন্যদিকে দীপাকে সে ছেড়ে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। দীপার মনটাও খারাপ হয়ে আছে নিলাদ্রী অসহায় মুখটাই বার বার মনে পরছিল। বাবা-মাকে এই বিয়েতে রাজী করানো খুব মুশকিল হবে। কি যে করবে দীপা বুঝতে পারছিলনা। খাবার টেবিলে কথা তুলতেই হল আর দীপা যেই ভয়টা করেছিল তাই হল। বাবা খাওয়া শেষ নাকরে উঠে গেল আর মা কাঁদতে শুরু করল।

পনেরো দিন হয়ে গেল মা-বাবা কথা বলছেনা। বাড়ীর থমথমে আবহাওয়ার জন্য বাড়ী ঢুকতেও ইচ্ছা করেনা। এইসব ভাবতে ভাবতেই বড় রাস্তা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো দীপা। ভিতর দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফেরা যাবে। আজ আবার দেরী হয়েছে, মা নিশ্চই চিন্তা করছে। হঠাৎ  সামনে ভুতের মত উদয় হল শংকর। দীপা চমকে গিয়েছিল। বিরক্ত হয়ে বলল “তুই এখানে!?”। শংকরের যেন উত্তর তৈরীই ছিল,বলল “সেম কথাতো আমিও বলতে পারি। পটলার হাত দিয়ে চিঠি পাঠালাম উত্তর দিলি না কেন?” দিপা আরও বিরক্ত হয়ে বলল “বয়সটা ভুলে যাস নাকি! এখন কি চিঠিচাপাটির বয়স আমাদের। রাস্তা ছাড় দেরি হয়ে যাচ্ছে।” শংকর দুপা এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল “ওঃ দেরি দেখাচ্ছে! রাতবিরেতে যখন ওই ছেলেটার সাথে বেলাল্লাপনা করিস তখন দেরি হয়না! কান খুলে শুনে রাখ, ওই ছেলেটার সাথে মেলামেশা বন্ধ কর বুঝলি। তুই শুধু আমার বুঝলি। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল ট্যাঁরা করতে আমি জানি।” দীপা রাগে অন্ধ হয়ে শংকর কে একধাক্কা দিয়ে বলল,“কি করবি তুই অ্যাঁ,কি করবি”  “কি করবো?”বলে এক হ্যাঁচকায় দীপা কাধে তুলে নিয়ে অলিগলি পেরিয়ে একটা পোড়ো বাড়ীতে এনে ফেলল। দীপা আত্মরক্ষার জন্য হাত পা ছুঁড়তে থাকে। শংকর দীপার ওরনা দিয়ে হাত আর পা বাঁধে। “আমি কি করতে পারি। এইবার দ্যাখ। আমার সন্তানের মা হলে তুই আর তোর বাড়ীরলোক ‘না’ কিকরে করবি রে!” শংকরের ব্যর্থ পৌরুষ বলে উঠল, “খবরদার কাউকে যদি আজকের ঘটনা বলেছিস তোদের হোল ফ্যামিলির মুন্ডু কেটে পুকুরে ভাসিয়ে দেব।”

দুদিন ধরে দীপা নীলের ফোন ধরেনি দেখাও করেনি। নীল পাগলের মত ফোন আর ম্যাসেজ করে চলেছে। কোনমুখে সে নীলেরসামনে গিয়ে দাঁড়াবে। কি বলবে সে নীলকে! মা বাবাকেও কিছু বলতে পারেনি মুন্ডু কাটার ভয়ে। লাঞ্চটাইমে নীচের মেডিকেল শপ্ টায় এক ৭২ঘন্টার মধ্যের নেবার মেডিসিন দিতে বলল। কখন যে পিছনে নীল এসে দাঁড়িয়েছে দীপা বুঝতেও পারেনি। “কি ব্যাপার কি হয়েছে তোমার?” নীলের গলা শুনে ফিরে নীলকে সামনে দেখে ভেঙ্গে পরলো দীপা। সবকিছু শুনে নিল বলে উঠলো “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ! আমাকে এত দূর্বল ভাবো তুমি।” দীপাকে হাল্কা করারজন্য চাপা গলায় নীল বলল“এইভাবে বুঝি বউ বুক করা যায়? তাহলে তো শংকরের বহু আগে আমি তোমায় বুক করেছি” দীপার হাত থেকে মেডিসিনটা নিয়ে নীল ছুঁড়ে ফেলে দিল।  দীপা হাঁহাঁ করে উঠলো “আরে ওটা ফেল না”। নীল দীপাকে শান্ত করে বসাল “সেদিনের ঘটনা ভগবানের অভিশাপ নয় গো আশির্বাদ। তোমার শরীরে এখন যে ফরমেশন নেবে সে আমার সন্তান। তোমার শরীরে যে বড় হবে,যাকে আমি মনের মত করে মানুষ করবো সেতো আমার সন্তান হবে। শুধু রক্তের পরিচয়ই কি বাবার একমাত্র পরিচয়,পালক পিতা কি পিতা হতে পারেনা!” দীপার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখল দীপা।  নীল দীপা কাঁধে হাত দিয়ে বলল “চলো আজ তোমার মা বাবার কাছে বিয়ের কথাটা পেড়েই ফেলি”

অভিশপ্ত নাকি কাকতালীয়

সকালবেলা রানুদির বকবকানির ঠ্যালায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। কাল অনেক রাত অবদি নীচের ঘরে দাদুর সাথে জেগেছিলাম। দাদুর কাছে মোটা লাল ভেলভেটের হলুদ হয়ে যাওয়া একটা বই আছে। বইটা লাল সাটিনের দড়ি দিয়ে বাঁধা। বইটা আসলে ছিল দাদুর নিজের দাদুর। উনি দাদুকে মৃত্যুর আগে বইটা দিয়ে যান। বইটা দেবার সাতদিন বাদে উনি মারা যান অদ্ভুত ভাবে। অদ্ভুত এইকারনে কারণ উনি দাদুকে বইটা দেবার সময় বলেছিলেন,“আমি বইটা খুলে পরেছি,আর সাতদিন বাদে আমি মরবো। এইবইটা তুমি রাখ। কখ্খনও খুলে পড়বেনা। তাহলে তুমিও মরবে”। বইটার মধ্যে এক একটা অধ্যায়ে এক একটা হত্যাকাণ্ড আছে। দাদুর বক্তব্য অনুযায়ী যে হত্যাকাণ্ডটি পরা হবে সেটিই নাকি ঘটবে। আর ঐ বইটা খুললে নাকি যার তত্ত্ববধানে ঐ বইটা থাকবে সে বই খোলার সাতদিন বাদে মারা যাবে। যত্তসব বুজরুকি! আমি মানিনি কাল রাতে চুপি চুপি দাদুর বইয়ের তাক থেকে বইটা নামিয়ে আমার ঘরে নিয়ে এসেছি। কাল অনেক রাত জেগে একটা গল্প পড়েছি। বেশ ইন্টারেস্টিং। শেষ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে।

তবে গল্পটা অনেকটা ব্যোমকেশ বক্সীর একটা গল্পের মত।গল্পটা হল এই রকম, এক মধ্যবয়স্ক লোক তার একতলার লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করতে করতে মারা যান। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল মানে নাইটল্যাচ লাগানো যেটা বাইরে থেকে টেনে দিলে লেগে যায়। চাবি ছাড়া বাইরে থেকে খোলা যায়না। প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়, চাকর দুধ দিয়ে গিয়েছিল, সেই দুধ খেয়ে বিষক্রিয়া হয়ে মারা যায়। চাকরকে গ্রেপ্তার করাহয়। কিন্তু পোষ্টমর্টেমের পর দেখা যায় বডির ডান ঘাড়ে একটা ছোট্ট আলপিন আমূল গেঁথে রয়েছে। বিষ ঐ পিনের আগাতেই ছিল এবং দুধে কোনও বিষের ট্রেস পাওয়া যায়নি। তদন্তে জানা যায় ভিকটিমের খুরতুতো ভাই বহুদিন বাদে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ফিরেছিল। ওখানকারই এক ট্রাইবাল গোষ্ঠীপতির কাছ থেকে ব্লোপাইপের ব্যবহার শেখে আর সেই প্রসেস অ্যাপলাই করে জানলার বাইরে থেকে বিষ পিন দিয়ে খুন করে।

আর ঘুম হলোনা। আজ রবিবার ব্রেকফাস্ট টেবিলে লুচি আলুরদম পরিবেশন করতে করতে মা বলল, “শান্তর বাবা কাল রাতে মারা গেছেন। এইতো ছেলেটা এল গত পরশু। বাবার সাথে কাটাতেও পারলোনা”
আমি জিগ্গেস করলাম,“কি হয়েছিল কাকুর। হার্ট অ্যাটাক?”
— “আরে না সেটাই তো আশ্চর্যের। এতদিনের বিশ্বস্ত চাকর বৃন্দাবন,সে কিনা মনিবকে মারল দুধে বিষ মিশিয়ে!কি দিনকাল পরেছে কাউকে বিশ্বাস করা যায়না!” মা বকবক করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেল। কিন্তু আমি যেন মুখে লুচি নিয়ে চিবাতে ভুলে গেছি। তাহলে কি দাদু ঠিকই বলেছিল। এখন আমি কিকরি। নিজের মাথাটা দেয়ালে ঠুকতে ইচ্ছা করছিল। কোনওরকমে খাওয়া শেষ করে দৌড়ে গেলাম ঘরে প্রতিম কে ফোন করতে। ওর বুদ্ধিটা দৌড়ায় বেশী।ব্যাটা আবার ফোনটা অফ করে বসে আছে । বাইরে যাবার কথা ছিল হয়তো তাই গেছে। প্রতিম ফিরতে ফিরতে তিনদিন কেটে গেল। আর এই তিন দিনে পোষ্টমর্টেম হয়ে এটাও বেরিয়ে গেল যে খুন বৃন্দাবন করেনি। যদিও সাসপেক্ট সে রয়েই যাচ্ছে। কারন দুধ দেওয়ার বহু পরে মৃত্যুর টাইম বেরিয়েছে পোষ্টমর্টেমে এবং ঘাড়ে বিষমাখানো পিন পাওয়া যায়। তাতেকি! বৃন্দাবন তো পরেও কার্য সিদ্ধি করতে পারে!আর যদি বৃন্দাবন না করে তাহলে কে করলো খুনটা। আমার বুক ধড়াসধড়াস করছে সব সময়। আমি জানি খুনটা করেছে শান্তদা, অন্ততঃ গল্প তো তাই বলছে। এদিকে দাদুরও হঠাৎ  শারিরীক  অবনতি শুরুহয়েছে। আমি কি করি দিশেহারা  এর মাঝে প্রতিম বাইরে থেকে ফিরলো।

প্রতিমকে সব ঘটনা বলে আমার খানিকটা হালকা লাগলেও নতুন চিন্তা ঢুকলো বইটা খোলার জন্য কি শেষে দাদুর মৃত্যুর জন্য দায়ী হবো! প্রতিম চিন্তিত  হয়ে ভাবছিল।
হঠাৎ বলে উঠলো,“আমার মাথায় এলনা দাদু বইটা এতদিন ধরে নিয়ে রাখল কেন”
ওর কথা শুনে আমার পিত্তি জ্বলে গেল,আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,“তাহলে কি করতো?”
—“কেন!পুড়িয়ে ফেলতো!” ওর কথায় আমিও আশ্চয্য হয়ে গেলাম। সত্যিই তো বই টা পুড়িয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত। আমরা ঠিক করলাম পরেরদিন প্রতিম দের ছাদে ওর মা বাবা অফিস চলে গেলে বইটা পুড়িয়ে ফেলব। এর মাঝে পুলিশ এসে শান্তদাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। মা আবার ‘সন্তান’ ‘বুকের রক্ত জল করে মানুষ করা’ এই সব সেন্টিমেন্টাল কথা ব্যবহার করে সারাদিন বকবক করে গেল। আমি ভয়ে আর দাদুর ঘরে যাইনি,যদি দাদু বইটার কথা জিগ্গেস করে!

বইটাকে পুড়িয়ে ভীষণ হালকা লাগছিল। দাদুও অপেক্ষাকৃত সুস্থ। দাদুর চোখে প্রতিম এখন হিরো। বাড়ীর লোক জানলোওনা কি হয়ে গেল কিন্তু আমার এখনও মনে হয় পুরোটাই কাকতালীয় আর কুসংস্কার।

Thursday, 29 September 2016

প্রত্যুত্তর

পায়েলের জন্য পাক্কা এক ঘন্টা হল বসে আছে তমাল। আজ প্রায় সাতদিন হয়ে গেল একটু বসে কথা বলার সুযোগ পায়নি তমাল। বহুবার বহুভাবে বোঝাতে চেয়েছে পায়েলের প্রতি তার ভালোবাসা কিন্তু পায়েল কোনও গুরুত্বই দেয়নি। উল্টে ঐ জাতীয় কথা বললে পায়েল তমালকে এড়িয়ে চলতে থাকে। সেটা আরও কষ্টের তাই নানা অজুহাতে পায়েলকে সে ডাকে। বেশীর ভাগই নোটস্ দেবার অজুহাতে ডাকে। আজ সেরকমই একটা দিন।
নাহ্ আজ আর বোধহয় পায়েল এলনা। ইতিমধ্যে পাঁচ কাপ কফি আর একটা ফিসফ্রাই খাওয়া হয়ে গেছে। তমাল উঠবো উঠবো করছে ঠিক তখনই লাল রঙের একটা ঝলক দেখতে পেল। হ্যাঁ পায়েল আজ এই রঙের চুড়িদার পরে কলেজ এসেছে। তমাল নিজেকে প্রস্তুত করতেনা করতেই পায়েল ঝড়ের মত এসে সামনের চেয়ারে বসলো।
“কই দে?” চেয়ারে বসেই পায়েলের প্রথম কথা।
ওকে দেখেই তমাল দুটো কফি আর একটা ফিসফ্রাই অর্ডার করেছিল। সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল,
—“দাঁড়া একটু সবুর করনা বাপু!তোর সাথেকি আমার শুধু নোটসের সম্পর্ক?”
এগিয়ে দেওয়া পিন আপ করা পাঁচ পৃষ্ঠার নোট টা পায়েল উলটে পালটে দেখতে বলল,—“তবে কি কফি-ফিস্ফ্রাই খাবার সম্পর্ক?”
—“ইয়ারকি করিস না। তুই জানিস কলেজের প্রতিটি মেয়ে আমার সাথে পাঁচটা মিনিট কাটাবার জন্য উৎসুক হয়ে থাকে। আর আমি এখানে তোর পিছনে আননেসেসারি একটা ঘন্টা নষ্ট করে ফেললাম।”
—“সত্যি!কেন করলি তুই!” পায়েলের ঠোঁটের কোনে শ্লেষের ে উঁকি দিচ্ছে সেটা তমালের চোখ এড়ালোনা।
—“তুই কি বুঝিসনা কিছুই!!আমি যে তোকে কতটা ভালোবাসি!!” তমাল যেন খাদের শেষ সীমায় চলে এসেছে।
কথাটা শুনেই চকিতে মুখ তুলে তাকাল পায়েল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। মনে হল নিজেকে যেন সংযত করলো। কয়েক  সেকেন্ড অপেক্ষা করে বলতে শুরু করলো,—“আমার বাবা নেই জানিস”
—“হ্যাঁ জানি তোর মা উইডো” তমাল সায় দিল
—“উইডো নয়। আমার মা জানেই না আমার বাবা কে!”
—“মানে!!” তমাল অবাক
—“আমার মা একজন যৌনকর্মী। আমি মায়ের আনচাহী সন্তান”
তমালের মুখ থেকে যেন কথা সরছিলনা। —“আমার মা-ও যৌনকর্মীর মেয়ে। যৌনকর্মীদের মেয়ে হলে মনে করে হাতে স্বর্গ পেল। মেয়েকে খাটিয়ে বৃদ্ধ বয়সে বসেবসে খাওয়া যায়। আমার দিদিমা নিজে হাতে ধরে আমার মাকে এই কাজে এনছিল। কিন্তু আমার মা আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। এখন আমি নিজের ইচ্ছায় এমবিএ করছি চাকরী করে মাকে আমার কাছে নিয়ে আসব। এই সব কাজ আর মাকে করতে দেবনা। আমার কাছে এই ভালোবাসা-টাসা করার সময় নেই।ছোটবেলা থেকে আমি মাকে পাইনি। চাকরী পেয়ে আমি মার কাছে থাকবো। ”
তমাল ফিসফ্রাইটা এগিয়ে দিয়ে বলল,—“ভালই হয়েছে ঐসব নোংরামি তোকে করতে হয়নি”
—“নোংরামি !!”মুহুর্তে ফুঁসে উঠল পায়েল।
—“তোর সোস্যাল ওয়াকার মা যখন সরকারী অনুদান পাবার জন্য বড় বড় অফিসারদের কমিসন হিসাবে যা দ্যান সেটা কি? তোর বড় কোম্পানিতে চাকরী করা ডাইরেক্টর বাবা যখন নিজের পিএর চাকরী বাঁচিয়ে রাখার অজুহাত দেখিয়ে ট্যুরে নিয়ে গিয়ে যা করেন সেটা কি?তুই এতবড় কলেজে চান্স পাবার জন্য ট্রাস্টিকে যা দিয়েছিস। সেটা কি? নোংরামি এগুলো। আমার মা দিদিমা যা করেছে,পেটের তাগিদে। আর তোরা যেটা করিস সেটা সুবিধা ভোগের তাগিদ,নোংরামি সেটা।”
তমাল থতমত খেয়ে গিয়েছিল।
পায়েল নোটগুলো গুছিয়ে তমালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,—“এই নোট গুলো আমার কোনও কাজে লাগবেনা। এগুলো আমি কালকেই লাইব্রেরিতে বসে তৈরি করে ফেলেছি। আমি বেরোলাম। ফিসফ্রাইটা তুই-ই খেয়ে নে”।
টেবিলের ওপর পরে থাকা ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বেড়িয়ে  গেল পায়েল। তমাল জানে এই শেষ দেখা।